Monday, January 14, 2019

এইবার হবে পিঠা গল্প এত আদর স্নেহ কিসের

পিঠা
বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম একটা আকর্ষণীয় জিনিস এই পিঠা। তার উপর এই পিঠা আবার খাবার জিনিস। আর খেতে তো সবারই ভালো লাগে। তাই পিঠাও সবারই প্রিয়। পিঠা খেতে ভালো লাগে না এমন কারো অকালকুষ্মান্ড চেহারা এখনো দেখিনি। 
আমারো পিঠা ভাল্লাগে।এর কারন দুইটা, প্রথমত আমি খেতে ভালোবাসি আর দ্বিতীয়ত আমার মুখখানা মোটেই অকালকুষ্মান্ডের মত না।
আমার এখন চিতই পিঠা টা ভালো লাগে। এখন ভালো লাগে বললাম কারন টা পরে বলছি। গোল,চ্যাপ্টা, একপাশ নরম আরেকপাশ একদমই হালকা পোড়া পোড়া আর কিছুটা মুচমুচে। ওই মুচমুচে দিকটা দাতের নিচে পরলেই কেমন যেনো একটা ভালোলাগা কাজ করে আমার।আর উপরের নরম দিকটা ভালো লাগে যদি কোন ভর্তা দিয়ে খাই। হ্যা, এই চিতই পিঠা আমার পছন্দ হওয়ার মূল কারন এই ভর্তা। একটা দুইটা না অনেক পদের ভর্তা দিয়ে খাওয়া যায় এই পিঠা। ঝাল ভর্তা, ধনেপাতা ভর্তা, শরিষা ভর্তা, শুটকি ভর্তা, টমেটো ভর্তা আরো কত কি। একবার তো শুনলাম শীতকালে মিরপুরে কোথায় নাকি ৪২ পদের ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠা বিক্রি করেন এক পিঠা বিক্রেতা। এই তথ্য পাওয়ার পর ভাবলাম ওই পিঠা বিক্রেতার পিঠা না খাই অন্তত ৪২ পদের ভর্তা দেখার জন্যে হলেও যাওয়া উচিৎ। যথারীতি বন্ধু বান্ধবের থেকে ঠিকানা যোগাড় করে এক শীতের সন্ধ্যায় ওই দোকানের সামনে যেয়ে উপস্থিত হলাম। আর সেখানে যেয়ে একটা জিনিস বুঝলাম যে মানুষ এইখানে পিঠা খেতে আসে না,আসে ওই ৪২ পদের ভর্তা খেতে।
এই গেলো এখনকার ভালোলাগা চিতই এর কথা এবার বলবো আগের ভালোলাগা ভাপা পিঠার কথা। হ্যা আগে ছোট বেলায় আমার পছন্দের পিঠা ছিলো এই ভাপা পিঠা। গ্রামে থাকতাম, অনেক ছোট ছিলাম নার্সারী তে পড়তাম তখন। শীতের সকালে দাদী বাড়ির উঠোনে ছোট্ট মাটির চুলোয় ভাপা পিঠা বিক্রি করতেন এক বুড়ি মহিলা। উনার বানানো ভাপা পিঠা আমার জীবনে খাওয়া সবচেয়ে মজাদার ভাপা পিঠা ছিলো। চালের গুড়ার তৈরী সাদা অংশ টা ছিলো একদম নরম স্পঞ্জের মত আর ভিতরে থাকতো কুসুম গরম গলে যাওয়া খেজুরের গুর। সকালে আমি স্কুলে যাওয়ার জন্য যখন তৈরী হতাম তখন ঘর থেকেই শুনতে পেতাম কেউ বলছে "ও বানু বড়মা আমার এই বাটিতি ৫ টা ধূপ্পিটে দেও দিনি,ওই সুহাগের বাপ খেইয়ে বেরবে এট্টু তাড়াতড়ি কইরে দেও" আবার কেউ বলতো "ওইদেকো শিগগি দেও দিনি পিটে গুনু আমার ছেইলের ইশকুলির যে দেরী হই যাচ্চে"। হ্যা, ওই বুড়ি মহিলার নাম ছিলো বানু বড়মা।বানু বড়মা বললাম কারন কখনো কাওকে বানু বড়মা ছাড়া অন্য কোন নামে উনাকে ডাকতে শুনিনি। ছোট বড়, ছেলে বুড়ো সবাই ই বানু বড়মা বলেই ডাকতো। আর একটা কথা আমাদের গ্রামে ভাপা পিঠাকে বলে ধূপ পিঠা। দাদীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম ভাপা পিঠাকে ধূপ পিঠা বলার কারন কি? দাদী বলেছিলেন পিঠা বানানোর পর পিঠার উপর দিয়ে যে ধোয়া সহ গরম ভাপ ওঠে মুলত ওই ধোয়ার কারনেই নাম হয়ে গেছে ধূপ পিঠা।
ক্লাস ওয়ান এ থাকাকালীন ঢাকায় চলে আসি।এর পর যখন ক্লাস এইট এ পড়ি তখন একদিন আম্মাকে বললাম ভাপা পিঠা বানিয়ে দিতে বানু বড়মার মত করে। বানু বড়মা ততদিনে খোদার প্রিয় হয়ে গেছিলেন। তাই অনেক দিন খাওয়া হয়নি উনার তৈরী সেই ভাপা পিঠা। আম্মা সেইদিন একটা একটা করে ভাপা পিঠা বানাচ্ছিলেন আর আমি তাতে কামড় দিয়ে বলছিলাম বানু বড়মার মত হয়নি এইটাও। একসময় আম্মা রান্না ঘর থেকে উঠে চলে যেতে যেতে বললেন "বানু বড়মার মত পিঠা খাওয়া লাগবে না, যা বানাইছি তাই খা"। আমার সামনে তখন সব আধ কামড়ানো ভাপা পিঠে পরে আছে আর সেইদিন আমি একটা জিনিস বুঝেছিলাম যে খাবার বানানো টা একটা আর্ট।
এখন শীতকালে প্রায়ই যখন বন্ধুদের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিভিন্ন পদের ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠা খাই তখন মাঝে মাঝেই চোখ চলে যায় সদ্য চুলা থেকে উঠানো গরম ধোয়া ওঠা ভাপা পিঠের উপর আর মনে পরে বানু বড়মার ধূপ্পিটের কথা।

No comments:

Post a Comment